ভারতের সংসদে এবং রাজ্যের বিধানসভাগুলিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনো বেশ কম। এই ছবি উঠে এসেছে সাম্প্রতিক সমীক্ষায়।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্ম (এডিআর)-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে মোট চার হাজার ৬৬৬ জন সাংসদ এবং বিধায়কের মধ্যে মাত্র ৪৬৪ জন নারী। অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ।
রিপোর্টে কী দেখা গেলো?
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। রিপোর্ট অনুযায়ী, লোকসভার মোট ৫৪৩ জন সাংসদের মধ্যে ৭৪ জন নারী। অর্থাৎ লোকসভায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় ১৪ শতাংশ। ২২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে নারী সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভাগুলিতে মোট চার হাজার ১২৩ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ৩৯০ জন নারী। অর্থাৎ রাজ্য বিধানসভাগুলিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় ৯ শতাংশ।
রাজ্যভিত্তিক হিসাবে উত্তরপ্রদেশে সবচেয়ে বেশি নারী বিধায়ক রয়েছেন। সেখানে নারী বিধায়কের সংখ্যা ৪৭। এর পরে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, যেখানে নারী বিধায়কের সংখ্যা ৪০। বিহারে ২৯ জন এবং মধ্যপ্রদেশে ২৭ জন নারী বিধায়ক রয়েছেন।
এডিআর এবং ন্যাশনাল ইলেকশন ওয়াচের বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, আদতে নারীদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে অনেক কম। লোকসভা এবং বিভিন্ন বিধানসভা নির্বাচনে মোট ৫১ হাজার ৭০৮ জন প্রার্থীর তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র পাঁচ হাজার ৯৫ জন নারী প্রার্থী ছিলেন, যা মোট প্রার্থীর প্রায় ১০ শতাংশ।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোট আট হাজার ৩৬০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮০০ জন নারী ছিলেন। অর্থাৎ মোট প্রার্থীর প্রায় নয় দশমিক ছয় শতাংশ। এছাড়া ৫৪৩টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে ১৫২টি কেন্দ্রে কোনও নারী প্রার্থীই ছিলেন না।
বিভিন্ন রাজ্যের ছবি
রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। বিভিন্ন রাজ্যের ৪৩ হাজার ৩৪৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র চার হাজার ২৯৫ জন নারী ছিলেন, যা মোট প্রার্থীর প্রায় ১০ শতাংশ।
দেশের চার হাজার ১২৩টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে এক হাজার ৬৯৮টি কেন্দ্রে কোনও নারী প্রার্থীই ছিল না। অর্থাৎ প্রায় ৪১ শতাংশ বিধানসভা কেন্দ্রে কোনও নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, কোনো রাজ্যেই নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ১৫ শতাংশের বেশি নয়। দিল্লি, ওডিশা, ছত্তিশগড়, উত্তরপ্রদেশ এবং ত্রিপুরায় তুলনামূলকভাবে বেশি নারী প্রার্থী দেখা গিয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে বিজেপি সবচেয়ে বেশি নারী প্রার্থী দিয়েছিল। তাদের মোট প্রার্থীর প্রায় ১৬ শতাংশ ছিলেন নারী। কংগ্রেস এবং সিপিএম উভয়ের ক্ষেত্রেই এই হার ছিল প্রায় ১৩ শতাংশ। বিএসপি প্রায় আট শতাংশ নারী প্রার্থী দিয়েছিল।
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৫৭ সালে যেখানে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৫ জন, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় আটশতে। সংখ্যাটি বৃদ্ধি পেলেও ভারতের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় এটি কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। আদর্শগতভাবে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী থাকা উচিত। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
দুই নেত্রীর বক্তব্য
পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে জিতে লোকসভার সদস্য হয়েছিলেন রত্না দে নাগ। এখন তিনি রাজ্য বিধানসভার সদস্য।
রত্না দে নাগ ডিডাব্লিউকে বলেন, "পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী রাজনীতিবিদ হওয়া মোটেও কঠিন কিছু নয়, বরং পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই নারীরা বর্তমানে রাজনীতি করছেন। বিধায়ক বা সাংসদদের মধ্যে নারীদের কম সংখ্যার নেপথ্যে সামাজিক বা ব্যক্তিগত লড়াইয়ের বিষয়টি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত অনেক বেশি তাৎপর্য রাখে। বিভিন্ন ছোট দল বা নির্দল হিসেবে নারীদের রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়ার কারণ ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, বরং সংগঠনের অভাব।"
বিজেপি মুখপাত্র কেয়া ঘোষ পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। রাজনীতিতে তার পথচলা সম্পর্কে ডিডাব্লিউকে বলেন, "রাজনীতিতে নারীদের পথ চলা কঠিন। সব পেশার মতো এখানেও 'গ্লাস সিলিং' থাকলেও বিজেপিতে নারীরা যথাযথ সম্মান পান। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান উত্তপ্ত রাজনীতিতে নিরাপত্তাহীনতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমি নিজেও বেলডাঙায় হামলার শিকার হয়েছি, তবে দলের সাংগঠনিক সংহতি ও কর্মীদের সমর্থন আমাকে সাহস জুগিয়েছে।"
বিজেপির হয়ে লোকসভা নির্বাচনে লড়েছিলেন সন্দেশখালির রেখা পাত্র। বাঁকুড়ার চন্দনা বাউরি বিধানসভা ভোটে জিতেছেন। বীরভূমের পরিচারিকা কলিতা মাঝির মতো প্রান্তিক নারী বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির টিকিটে লড়েছিলেন।
কেয়া বলেন, "রেখা পাত্র ,চন্দনা বাউরি, কলিতা মাঝি আমাদের অনুপ্রেরণা। ওড়িশার মফস্বল থেকে মাননীয় রাষ্ট্রপতির রাইসিনা হিলসে উত্তরণই প্রমাণ করে যে সদিচ্ছা থাকলে নারীরা যে কোনো উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন। স্বচ্ছ কাজের মানসিকতা ও মানুষের জন্য কাজ করার সহজাত স্পৃহা নিয়ে সমাজের সব স্তরের নারীদের রাজনীতিতে আরও বেশি করে আসা প্রয়োজন।"
সমীক্ষক সংস্থার মত
রিপোর্ট অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু দেশের সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনও খুবই কম। কেন এই পরিস্থিতি?
এডিআর-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার সঞ্চালক উজ্জয়নী হালিম ডিডব্লিউকে বলেন, "স্বাধীনতার এত বছর পরেও রাজনীতিতে নারী প্রতিনিধির হার কম। এর প্রধান কারণ, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, যার ফলে নারীদের টিকিট দেওয়ার হার মাত্র ১০-১৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকে। এমনকী যারা নির্বাচিত হচ্ছেন, তাদের বড় অংশই কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। এই বিশাল লিঙ্গ বৈষম্য মোকাবিলায় কেবল নারী সংরক্ষণ আইনের দ্রুত প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।"
তিনি বলেন, "নির্বাচনে অর্থ ও পেশিশক্তির দাপট সাধারণ বা নির্দল নারী প্রার্থীদের জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই দেশের ৪৯ শতাংশ ভোটারের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব ও নীতি নির্ধারণের স্তরে নারীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবেই। সেজন্য পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে একটি জোরালো সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার যাতে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন হয়।"
বিশেষজ্ঞের বক্তব্য
নারীদের উত্থানের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পুরুষতান্ত্রিকতা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মইদুল ইসলাম ডিডাব্লিউকে বলেন, "তৃণমূল কংগ্রেস নারী-কেন্দ্রিক একটি দল হওয়ায় এবং গত ১৫ বছরে মহিলাদের মধ্যে একটি শক্ত রাজনৈতিক ভিত তৈরি করতে পারায় সেখানে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন বেশি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, কেরালায় নারীরা উচ্চশিক্ষিত ও বিভিন্ন পেশায় সফল হলেও সিপিআইএম বা বামপন্থি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামো এখনো প্রবলভাবে পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় সেখানে নীতি-নির্ধারণের স্তরে বা সংসদীয় রাজনীতিতে নারীদের সুযোগ অনেক কম।"
১৯৯২ সালের ৭৩তম এবং ৭৪তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে পঞ্চায়েত ও পুরসভার মতো স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছিল। ভারতের অধিকাংশ রাজ্যই নারীদের জন্য এই কোটা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করেছে। এই কারণেই স্থানীয় সরকার বা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোতে নারী প্রতিনিধিদের সর্বভারতীয় হার এখন ৪৪ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান স্মরণ করে দিয়েও মইদুল বলেন, "রাজনীতিতে জয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকে নারীরা এখনো পুরুষদের তুলনায় পিছিয়ে, বিশেষ করে নির্দল বা ছোট দলগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও প্রকট। তাই নারীদের প্রকৃত ক্ষমতায়ন ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংসদে পাস হওয়া ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণ বিলটি দ্রুত কার্যকর করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর টিকিট বণ্টনে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন।"
প্রান্তিক নারীদের ক্ষেত্রে ছবিটা কী রকম? মইদুল বলেন, "মুসলিম নারী, দলিত বা আদিবাসী নারীদের রাজনীতির মূলস্রোতে আসার হার অত্যন্ত কম। ভারতের দীর্ঘ ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাত্র ১৮ জন মুসলিম নারী সংসদ সদস্য হতে পেরেছেন। অনেক ক্ষেত্রে দলিত বা আদিবাসী সংরক্ষিত আসনগুলোতেও রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের চেয়ে পুরুষদের প্রার্থী হিসেবে বেশি অগ্রাধিকার দেয়। জেতার সক্ষমতা বা 'উইনেবিলিটি'কে অনেক সময় অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয়, কিন্তু শক্তিশালী সাংগঠনিক সমর্থন থাকলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ জয়ী হতে পারেন।"
