প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ছবিটা রীতিমতো বৈচিত্র্যময় ! উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীদের যেমন ছড়াছড়ি, তেমনই এমন প্রার্থীও রয়েছেন যাঁরা স্কুলের গণ্ডিও পেরোননি !
![]()
গণতান্ত্রিক কাঠামোয় জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনও শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি নেই । সংবিধান অনুযায়ী যে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকই নির্বাচনে লড়ার অধিকারী । তবে যাঁরা সাধারণ মানুষের হয়ে বিধানসভায় আইন প্রণয়ন করবেন, তাঁদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে নাগরিক সমাজে তর্ক দীর্ঘদিনের ।
এমন আবহে 2026 সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার যে ছবিটা সামনে এল, তা রীতিমতো বৈচিত্র্যময় ! একদিকে যেমন উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীদের ছড়াছড়ি, তেমনই অন্যদিকে এমন প্রার্থীও রয়েছেন যাঁরা স্কুলের গণ্ডিও পেরোননি । এমনকি, কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী বেশ কয়েকজন প্রার্থী একেবারে নিরক্ষর !
নির্বাচন কমিশনে প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (এডিআর) এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকশন ওয়াচ যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার এক বিস্তৃত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে । রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রথম দফার মোট 1 হাজার 475 জন প্রার্থীর হলফনামা খতিয়ে দেখা হয়েছে । পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম দফায় অংশ নেওয়া অর্ধেক প্রার্থীই বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষায় শিক্ষিত । 735 জন অর্থাৎ প্রায় 50 শতাংশ প্রার্থী তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পাশ বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন ।
তবে আশার কথা হল, বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে উচ্চশিক্ষিতদের উপস্থিতিও বেশ উল্লেখযোগ্য । এডিআর এর রিপোর্ট বলছে, এবারের ভোটে 681 জন প্রার্থী অর্থাৎ প্রায় 46 শতাংশ প্রার্থীই স্নাতক বা তারও বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী । এঁদের মধ্যে অনেকেই স্নাতকোত্তর, আবার কেউ কেউ ডক্টরেট ডিগ্রিধারী ! এছাড়া, 25 জন প্রার্থী ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেছেন বলে নিজেদের হলফনামায় জানিয়েছেন ।
মুদ্রার উলটো পিঠও রয়েছে । এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে, যেখানে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রায় সব ক্ষেত্রেই অপরিহার্য, সেখানে বিধানসভার লড়াইয়ে এমন প্রার্থীরাও রয়েছেন, যাঁদের প্রথাগত শিক্ষা একেবারেই নেই । পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম দফায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা 20 জন প্রার্থী নিজেদের কেবলমাত্র 'অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন' বা সাক্ষর বলে উল্লেখ করেছেন । সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, এই 1 হাজার 475 জন প্রার্থীর মধ্যে 14 জন প্রার্থী পুরোপুরি 'নিরক্ষর' ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান আমাদের গণতান্ত্রিক বৈচিত্র্যেরই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি । একদিকে যেমন উচ্চশিক্ষিত পেশাদাররা রাজনীতিতে আসছেন, তেমনই তৃণমূল স্তরের মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ থাকা স্বল্পশিক্ষিত নেতারাও টিকিট পাচ্ছেন । সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে টিকিট বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে অনেক বেশি প্রাধান্য পায় তাঁর 'উইনেবিলিটি' বা জেতার ক্ষমতা । প্রার্থী স্থানীয় স্তরে কতটা প্রভাবশালী, দলের হয়ে কতটা পেশিশক্তি বা অর্থবল প্রয়োগ করতে পারবেন এবং সর্বোপরি তিনি ভোট টেনে আসন জেতাতে পারবেন কি না, টিকিট পাওয়ার ক্ষেত্রে সেটাই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায় ।
আইনসভায় নিত্যনতুন বিল পাশ, বাজেট বিশ্লেষণ বা জটিল আইনি বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য জনপ্রতিনিধিদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে করেন ওয়াকিবহাল মহলের একটা বড় অংশ । কিন্তু গণতন্ত্রে শেষ কথা বলেন গণদেবতা । এখন দেখার, ভোট দেওয়ার সময় সাধারণ মানুষ প্রার্থীর উচ্চশিক্ষার ডিগ্রিকে গুরুত্ব দেবেন নাকি ভরসা রাখবেন প্রার্থীর স্থানীয় প্রভাব, পরিচিতি ও রাজনৈতিক দলের প্রতীকে !
