Skip to main content
Source
ETV Bharat
Author
ETV Bharat Bangla Team
Date

ভোট ময়দানে প্রার্থীদের খুঁটিনাটি বিবরণ বরাবরই পাঠকের নজরকাড়ে ৷ ADR রিপোর্টে এবারে কোটিপতি প্রার্থী বেশি কোন দলে, বিশ্লেষণে ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি সুরজিৎ দত্ত ৷

Crorepati Candidates in first phase election of west bengal

টানা পনেরো বছর ধরে রাজ্যের ক্ষমতায় তৃণমূল কংগ্রেস । 'মা-মাটি-মানুষ'-এর স্লোগান তুলে 2011-এ বাংলার মসনদে বসেছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায় । তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে । 2026-এর বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম দফার লড়াইয়ের আগে ফের যখন জনতার দরবারে হাজির তৃণমূল নেত্রী, তখন তাদের প্রার্থীদের হলফনামা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো ।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাওয়া মানুষের দৈনন্দিন অবস্থা যাই হোক না কেন, বাংলার শাসক দলের নেতা-নেত্রীরা যে লক্ষ্মীর কৃপাদৃষ্টি থেকে এতটুকুও বঞ্চিত হননি, অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (ADR) ও ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকশন ওয়াচ-এর পরিসংখ্যান সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ।

ADR-এর রিপোর্ট বলছে, বাংলার প্রথম দফার ভোটে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যায় প্রধান বিরোধী দল বিজেপি বা বাম-কংগ্রেসকে বহু যোজন পিছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করেছে 15 বছর রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস ।

প্রথম দফার নির্বাচনে মোট 1475 জন প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করেছে সংস্থাটি । পরিসংখ্যান বলছে, এই 1475 জনের মধ্যে 306 জন প্রার্থীই কোটিপতি ! অর্থাৎ, প্রথম দফায় লড়তে নামা প্রতি পাঁচ জন প্রার্থীর মধ্যে একজন কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক । সব দলের প্রার্থীদের মিলিয়ে গড় সম্পত্তির পরিমাণও নেহাত কম নয়, প্রায় 1.05 কোটি টাকা ।

তবে রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে দলভিত্তিক কোটিপতি প্রার্থীদের পরিসংখ্যান । রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এই দৌড়ে একেবারে ফার্স্ট বয় । প্রথম দফায় তৃণমূলের টিকিট পাওয়া 148 জন প্রার্থীর মধ্যে 106 জনই কোটিপতি । শতকরা হিসেবে যা প্রায় 72 শতাংশ ৷

Crorepati Candidates in first phase election of west bengal

অন্যদিকে, রাজ্যে পালাবদলের স্বপ্ন দেখা প্রধান বিরোধী দল বিজেপিও খুব একটা পিছিয়ে নেই । তাদের 152 জন প্রার্থীর মধ্যে 71 জন (47 শতাংশ) কোটি টাকার সম্পত্তির অধিকারী । সম্পদের এই হিসেব থেকে বাদ যায়নি 'সর্বহারার দল' সিপিআই(এম)-ও । তাদের 98 জন প্রার্থীর মধ্যে 24 জনই (24 শতাংশ) কোটিপতি । জাতীয় কংগ্রেসের 151 জন প্রার্থীর মধ্যে 30 জন (20 শতাংশ) কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক ।

প্রার্থীদের গড় সম্পদের দিক থেকেও শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসই সবচেয়ে এগিয়ে । তৃণমূলের 148 জন প্রার্থীর প্রত্যেকের গড় সম্পদের পরিমাণ প্রায় 2.90 কোটি টাকা । সেখানে বিজেপির 152 জন প্রার্থীর গড় সম্পদ 2.53 কোটি টাকা । কংগ্রেস প্রার্থীদের গড় সম্পদ 2.03 কোটি টাকা এবং সিপিআই(এম) প্রার্থীদের গড় সম্পদ 46 লক্ষ টাকার সামান্য বেশি ।

হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় রাজ্যের সবথেকে ধনী প্রার্থীও শাসকদলেরই । তিনি হলেন জঙ্গিপুর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সমীর কুমার ৷ যাঁর ঘোষিত মোট সম্পত্তির পরিমাণ 100 কোটি টাকারও বেশি ৷ ধনী প্রার্থীদের প্রথম তিনে রয়েছেন দক্ষিণ বারাসত কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী রুবি ঘোষও ৷ যাঁর সম্পত্তি 23 কোটি টাকার বেশি । মাঝখানে রয়েছেন বাঁকুড়ার বিজেপি প্রার্থী গৌতম মিত্র (25 কোটি টাকার বেশি সম্পত্তি) ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই বিপুল সংখ্যক কোটিপতি প্রার্থীর পরিসংখ্যান আসলে 15 বছর টানা ক্ষমতায় থাকারই সরাসরি প্রতিফলন । রাজনীতিতে এখন একটা কথা খুব প্রচলিত 'উইনেবিলিটি' বা জেতার ক্ষমতা । বর্তমান সময়ের নির্বাচনে অর্থবল এবং পেশি শক্তি ছাড়া এই 'উইনেবিলিটি' অর্জন করা কার্যত অসম্ভব ।

15 বছর ক্ষমতায় থাকার সুবাদে রাজ্যের শাসকদলের চারপাশে এমন একটা বিত্তবান রাজনৈতিক শ্রেণির উত্থান হয়েছে, যারা নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা খরচ করার ক্ষমতা রাখে । পাশাপাশি, ক্ষমতার অলিন্দে থাকার কারণে অনেকের সম্পদ ফুলেফেঁপে উঠেছে । দলীয় নেতৃত্বও মনে করছে, নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে গেলে পকেটে রেস্তো থাকা এমন 'বাহুবলী' বা 'ধনকুবের' নেতারাই সবচেয়ে ভরসাযোগ্য । তাই শিক্ষিত, সাধারণ, নিচুতলার কর্মীদের বদলে টিকিট বণ্টনের সময় শিকে ছিঁড়ছে কোটিপতিদের ভাগ্যেই ।

অন্যদিকে, এডিআর-এর রিপোর্ট এই বৈষম্যের আরেকটা দিকও তুলে ধরেছে । যেখানে শাসকদল বা বিরোধীদের কোটিপতি প্রার্থীদের ছড়াছড়ি, সেখানে এমন প্রার্থীও আছেন যাঁদের পকেটে হাজার টাকাও নেই । ডোমকলের এক নির্দল প্রার্থীর মোট সম্পদ মাত্র 500 টাকা, কিংবা মেদিনীপুর ও মানবাজারের দুই প্রার্থীর সম্পদ মাত্র 1000 টাকা । সম্পদের এই আকাশ-পাতাল ফারাক বুঝিয়ে দেয়, ভোট বড় বালাই হলেও, ভোটের ময়দান সকলের জন্য সমান নয় । সাধারণ মানুষের হয়ে কথা বলার দাবিদার নেতারা আসলে সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার কতটা বাইরে, এডিআর-এর এই রিপোর্ট যেন সেই নির্মম সত্যটাই বাংলার ভোটারদের সামনে আরও একবার নগ্ন করে দিল ।


abc